NBFC কী?

0

NBFC কী? ব্যাংক এবং NBFC-এর মধ্যে আসল পার্থক্য কী?

Bank vs nbfc difference


আমাদের দেশে যখনই লোন (Loan) নেওয়া বা ক্রেডিট কার্ডের কথা আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সবার আগে আমাদের মাথায় আসে SBI, HDFC বা ICICI-এর মতো বড় বড় ব্যাংকের নাম। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই প্রথাগত ব্যাংকগুলোর বাইরেও এমন অনেক বড় বড় কোম্পানি বাজারে রয়েছে যারা আমাদের লোন দেয়, ইন্সুরেন্স করায় এবং ফাইন্যান্সের অন্যান্য সমস্ত সুবিধা দিয়ে থাকে? আর্থিক জগতের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকেই বলা হয় NBFC বা Non-Banking Financial Company।

আজকের আর্টিকেলে আমরা খুব সহজ ভাষায় আলোচনা করব NBFC কী, এটি কীভাবে কাজ করে এবং একটি সাধারণ ব্যাংকের সাথে এর আসল ও মৌলিক পার্থক্যগুলো ঠিক কোথায় কোথায় রয়েছে।

NBFC কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?


NBFC-এর পুরো নাম হলো নন-ব্যাংকিং ফাইনান্সিয়াল কোম্পানি। সহজ কথায় বলতে গেলে, এটি এমন এক ধরণের আর্থিক প্রতিষ্ঠান যা সরাসরি কোনো ব্যাংক না হয়েও সাধারণ মানুষকে ব্যাংকের মতোই বিভিন্ন ধরণের ফাইনান্সিয়াল বা আর্থিক সেবা দিয়ে থাকে। এই কোম্পানিগুলো ভারতের 'Companies Act' বা কোম্পানি আইনের অধীনে রেজিস্টার্ড হয়। তবে ব্যাংক না হলেও এদের মূল ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য দেশের সর্বোচ্চ ব্যাংক অর্থাৎ RBI (Reserve Bank of India) থেকে স্পেশাল লাইসেন্স ও অনুমতি নিতে হয়।

আমাদের চারপাশে আমরা প্রতিনিয়ত যেসব কোম্পানি যেমন—Bajaj Finance, Muthoot Finance, Tata Capital, Mahindra Finance কিংবা Faircent-এর মতো লেন্ডিং প্ল্যাটফর্মগুলোর নাম শুনি, এগুলো সবই আসলে এক একটি জনপ্রিয় NBFC। এরা মূলত সাধারণ মানুষের পার্সোনাল লোন, হোম লোন, গোল্ড লোন, গাড়ির লোন এবং ইন্সুরেন্স বা মিউচুয়াল ফান্ডের মতো সুবিধাগুলো দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে।

ব্যাংক এবং NBFC-এর মধ্যে মূল পার্থক্যগুলো কী কী?


আপাতদৃষ্টিতে ব্যাংক এবং NBFC-এর কাজ এক মনে হলেও, দেশের আইন এবং অধিকারের দিক থেকে এদের মধ্যে কিছু বিশাল ও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। নিচে মূল পার্থক্যগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. আইনি গঠন ও রেজিস্ট্রেশন


প্রথম এবং প্রধান পার্থক্যটি হলো এদের আইনি কাঠামোয়। দেশের যেকোনো সাধারণ ব্যাংক তৈরি এবং পরিচালিত হয় মূল ব্যাংকিং আইন অর্থাৎ 'Banking Regulation Act, 1949'-এর কড়া নিয়মকানুনের অধীনে। অন্যদিকে, একটি NBFC বা নন-ব্যাংকিং ফাইন্যান্সিয়াল কোম্পানি রেজিস্টার্ড হয় ভারতের সাধারণ কোম্পানি আইন বা 'Companies Act'-এর অধীনে।

২. অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধা (CASA Account)


আপনি যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি ব্যাংকের শাখায় গিয়ে খুব সহজেই নিজের নামে একটি সেভিংস অ্যাকাউন্ট (Savings Account) বা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট (Current Account) খুলতে পারেন, যেখানে প্রতিদিনের টাকা লেনদেন করা যায়। কিন্তু কোনো NBFC-তে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য এই ধরণের কোনো অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধা থাকে না। অর্থাৎ, আপনি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মতো সাধারণ ব্যাংকিং NBFC-তে করতে পারবেন না।


৩. ডিমান্ড ডিপোজিট এবং টাকা তোলার নিয়ম


ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে আপনি যখন খুশি এটিএম (ATM) কার্ড দিয়ে বা উইথড্রয়াল স্লিপ দিয়ে সেই টাকা তুলে নিতে পারেন, যাকে ব্যাংকিংয়ের ভাষায় 'ডিমান্ড ডিপোজিট' বলা হয়। কিন্তু NBFC কোম্পানিগুলো জনসাধারণের কাছ থেকে এই ধরণের কোনো ডিমান্ড ডিপোজিট গ্রহণ করতে পারে না। কিছু নির্দিষ্ট NBFC শুধু 'টাইম ডিপোজিট' বা ফিক্সড ডিপোজিট নিতে পারে, যা একটি নির্দিষ্ট সময় পূরণ হওয়ার পরেই তোলা সম্ভব।

৪. নিজস্ব চেক ইস্যু করার ক্ষমতা


একটি ব্যাংক দেশের পেমেন্ট ও সেটেলমেন্ট সিস্টেমের সরাসরি অংশ হওয়ায় তারা গ্রাহকদের নিজেদের নামে চেক বুক ইস্যু করতে পারে। অর্থাৎ, আপনি ব্যাংকের চেক দিয়ে যেকোনো বড় লেনদেন করতে পারেন। কিন্তু কোনো NBFC কোম্পানি নিজের নামে কোনো চেক ইস্যু করতে পারে না এবং তারা অন্য কোনো ব্যাংকের চেক সরাসরি ক্লিয়ার করার অধিকারও রাখে না।


৫. গ্রাহকের টাকার সরকারি নিরাপত্তা 


এটি গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে বড় এবং জরুরি একটি পার্থক্য। ব্যাংকে আপনার জমানো টাকার ওপর সরকারের 'DICGC'-এর পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বীমা বা ইন্সুরেন্সের গ্যারান্টি থাকে। কোনো কারণে ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেলেও আপনি ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন। কিন্তু কোনো NBFC-তে জমানো বা ইনভেস্ট করা টাকার ওপর এই ধরণের কোনো সরকারি বীমা বা সুরক্ষার গ্যারান্টি থাকে না।

আমজনতার জন্য NBFC-এর সুবিধা ও প্রয়োজনীয়তা


এত সব নিয়মের কড়াকড়ি এবং পার্থক্য থাকার পরেও ব্যাংক ছেড়ে কোটি কোটি মানুষ কেন NBFC-এর কাছে যায়? এর পেছনে প্রধান কারণ হলো এদের সহজ এবং নমনীয় নিয়মকানুন। ব্যাংকের তুলনায় একটি NBFC থেকে লোন পাওয়া অনেক বেশি সহজ ও ঝামেলাহীন। ব্যাংকে লোনের জন্য যে পরিমাণ কাগজের কাজ এবং ডকুমেন্টেশন দেখাতে হয়, NBFC-তে সেই প্রক্রিয়াটি অনেকটাই শিথিল করা থাকে।

সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ক্রেডিট স্কোর বা CIBIL স্কোরের ক্ষেত্রে। আপনার সিবিল স্কোর যদি কিছুটা কমও থাকে, তাহলেও অনেক NBFC আপনাকে লোন দিতে রাজি হয়ে যায়, যা একটি প্রডিং ব্যাংক কখনোই করবে না। তাছাড়া, ডিজিটাল টেকনোলজি ব্যবহার করার কারণে এই কোম্পানিগুলো মাত্র কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লোন অ্যাপ্রুভ করে সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা ট্রান্সফার করে দেয়।

শেষ কথা (Conclusion)


সহজ কথায় বলতে গেলে, NBFC হলো আধুনিক যুগের ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত সহজ ও দ্রুত বিকল্প। ব্যাংক যেখানে কড়া নিয়মের ভেতর দিয়ে চলে, সেখানে NBFC সাধারণ মানুষের লোন বা ফাইন্যান্সের ছোটখাটো প্রয়োজনগুলোকে খুব দ্রুত পূরণ করে দেয়। তবে গ্রাহক হিসেবে সবসময় মনে রাখা উচিত, যেকোনো NBFC থেকে লোন নেওয়ার আগে বা টাকা ইনভেস্ট করার আগে সেটি রিজার্ভ ব্যাংক (RBI) দ্বারা অনুমোদিত কি না, তা ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।


Post a Comment

0Comments

Post a Comment (0)